ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা: আতঙ্ক প্রস্তুতি ও করণীয়

আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, উপকূলীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঅঞ্চলে ৫.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের  জেলা সাতক্ষীরা। আকস্মিক এই কম্পনে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ভবন থেকে বাহিরে খোলা স্থানে আশ্রয় নেন। যদিও প্রাথমিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবু এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, এবং সচেতনতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা: আতঙ্ক প্রস্তুতি ও করণীয়
ছবি: MBF News

ভূমিকম্পের প্রকৃতি ও প্রভাব


রিখটার  স্কেলে ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প মাঝারি ধরনের হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের কম্পন সাধারণত ঘরবাড়ি কাঁপিয়ে দেয়, দেয়ালে ফাটল ধরাতে পারে এবং দুর্বল বা পুরোন স্থাপনা  ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আজকের কম্পানটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও, অনেকের  কাছে সময়টা দীর্ঘ মনে হয়েছে- যা স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া।


রাজধানী ঢাকা ছাড়াও খুলনা, যশোর, বরিশালসহ আশপাশের এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে  জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা হাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি ছিল।



কেন বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি?


বাংলাদেশের ভৌগোলিকভাবে কয়েকটি সত্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত। ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও সঞ্চালনের কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।



সাধারণত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও প্রতিক্রিয়া


আজকের ভূমিকম্পে বহু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। অনেকেই অফিস, বাসা ও মার্কেট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ সিঁড়ি ব্যবহার না করে লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।


ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন ভাবে পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ দৌড়াদৌড়ি করলে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে বহুতল ভবনে।



ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?  


১. ভবনের ভিতরে থাকলে

  • মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন।
  • মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন।
  • জানালা, কাঁচ ও ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন
২. ভবনের বাহিরে থাকলে।
  • খোলা জায়গায় দাঁড়ান
  • বৈদ্যুতিক খুঁটি সাইনবোর্ড বা পুরানো দেয়াল থেকে দূরে থাকুন।

৩. লিফট ব্যবহার করবেন না।

  • কম্পন শুরু হলে কখনোই লিফটে উঠবেন না।

৪. গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পরীক্ষা করুন

  • কম্পন থেমে গেলে গ্যাস লিকেজ বা শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনা আছে কিনা দেখুন।

ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি


ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ জরুরী-

  • বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ: প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে  মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। 
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল, কলেজ ও অফিসে নিয়মিত মহড়া (ড্রিল) আয়োজন করা উচিত‌।
  • জরুরী কিট প্রস্তুত রাখা: টর্চ লাইট, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, পানির বোতল, শুকনো খাবার, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি ইত্যাদি একটি ব্যাগে প্রস্তুত রাখা ভালো।
  • পরিবারের পরিকল্পনা: জরুরি অবস্থায় কোথায় একত্রিত হবেন এবং কাকে ফোন করবেন, আগে ঠিক করে রাখা উচিত। 


উপকূলী অঞ্চলের বিশেষ ঝুঁকি


উৎপত্তিস্থল যেহেতু সাতক্ষীরা, তাই উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় জেলা হওয়ার এখানে মাটি তুলনামূলক নরম, যা কম্পনের প্রভাব বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়‌ ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকায় ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।



সরকারের ভূমিকা ও দায়িত্ব 


ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ এবং প্রয়োজনীয়তা  সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সরকারের প্রধান দায়িত্ব।


একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। হাসপাতাল, স্কুল, সরকারি অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত করা জরুরি।



আতঙ্ক নয়, সচেতনতা হোক প্রধান শক্তি


ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনায়। এটি হঠাৎ আসে এবং অল্প সময়েই শেষ হয়। কিন্তু এর প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যদি আমরা প্রস্তুত না থাকি। আজকের ৫.৪ মাত্রার কম্পন হয়তো বড় ক্ষতি করেনি, তবে এটি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা।


সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নিজের জানবো, অন্যকে জানাবো এবং গুঞ্জন ছড়ানো থেকে বিরত থাকবো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার না করাই ভালো।



উপসংহার


ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আজকের ৫.৪ মাত্রার ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিল বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কম্পন বেশি অনুভূত অনুভূত হয়েছে। যদিও বড় ধরনের ক্ষতির খবর নেই, তবুও এখনই সময় সচেতন হওয়ার।


প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল  আচরণেই পারে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে। আতঙ্ক নয়, বরং জ্ঞানও প্রস্তুতিই হোক আমাদের প্রধান ভরসা।



বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url