জামায়াত আসলে জিতেছে, না হেরেছে

বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলো। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা আর কয়েকটি দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাকে বাদ দিলে সামগ্রিক চিত্র তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ। অনেক কেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকেরাও বেশ খোলামেলাভাবে মাঠ ঘুরে ভোট পর্যবেক্ষণ করেছেন।

জামায়াত আসলে জিতেছে, না হেরেছে
ছবি: MBF News
নির্বাচনের দিন সাংবাদিকদের সামনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।


প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। 


জামায়াত-এনসিপির ১১ দলীয় জোট দ্বিতীয় শক্তি; ইসলামী আন্দোলন ও কয়েকজন স্বতন্ত্রসহ কিছু ছোট শক্তিও সংসদে পৌঁছেছে। 


অর্থাৎ ক্ষমতার লড়াইয়ে বিএনপি স্পষ্ট বিজয়ী, আর জামায়াত সংখ্যার হিসাবে উল্লেখযোগ্য অর্জন করেও রাজনৈতিক অর্থে পরাজিত শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।


জামায়াতের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস পাশে রেখে দেখলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯১ সালে তারা ১৮টি আসন পেয়েছিল, ১৯৯৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে তিনে। 


২০০১ সালে বিএনপি জোটের অংশ হিসেবে ১৭টি, আর ২০০৮ সালে মাত্র দুটি আসন নিয়ে তারা সংসদে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আদালতের রায়, দমন-পীড়ন এবং সংগঠনগত সংকটের কারণে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। 


সেই প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন তাদের জন্য নিঃসন্দেহে পুনরাগমনের নির্বাচন। আসনের সংখ্যা আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে।


কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের বাস্তবতায় এবার নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা মূলত বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি এই দুই বাইনারিতে গিয়ে ঠেকেছে। 


এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে একটা বড় দল অনুপস্থিত, জামায়াতের সামনে ছিল দুই ধরনের সুযোগ: সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ অর্জন করা, আর রাজনৈতিকভাবে মধ্যম ভোটারকে আশ্বস্ত করা যে তারা একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প। প্রথমটা তারা করেছে, দ্বিতীয়টা করতে পারেনি।


প্রশ্নটা তাই দাঁড়ায়: জামায়াত আসলে জিতেছে, না হেরেছে? আমার মনে হয়, বিষয়টা বোঝার জন্য আগস্ট ৫-এর সরকার পতনের পরের সময়টা একটু ফিরে দেখা জরুরি।


আগস্ট ২০২৪ সরকারের পতনের পর জামায়াত ও দলটির ছাত্রসংগঠন শিবির খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় মাপের সংগঠিত শক্তি নিয়ে মাঠে চলে আসে। 


স্বৈরাচারী হাসিনা আমলে টানা দমন-পীড়নের পরে তারা অনেক ক্ষেত্রেই গোপনে বা ‘লো প্রোফাইলে রাজনীতি করত, সেই তুলনায় তাদের প্রত্যাবর্তন ছিল বেশ জোরালো।


কালচারাল ওয়ার স্বাভাবিকভাবেই এক বড় অংশের ভোটারের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিবারেল, সেক্যুলার, মধ্যপন্থী—যাঁরা একে অন্যের সঙ্গে একমত নন, তাঁরাও এই ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রে একজোট হয়েছেন। 


ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা অনেক ভোটারের কাছে হয়ে গেছে বিএনপি বনাম জামায়াত না, বরং ‘কালচারাল ওয়ার বনাম তুলনামূলক নরম বিকল্প।


বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-সমর্থিত প্যানেল ভালো ফল করল। প্রশাসন, পুলিশ, আনসার—সবকিছু প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায় একধরনের রাজনৈতিক ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছিল সেখানে জামায়াত দ্রুত সংগঠিত উপস্থিতি দেখাতে পারল। 


গণমাধ্যমে, টক শোতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বলতে শুরু করলেন, জামায়াত খুব অর্গানাইজড দল, সবচেয়ে প্রস্তুত তারাই।


শেষ সপ্তাহগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন ধারণাও ছড়াতে থাকল যে তারা এককভাবে সরকার গঠন করে ফেলতে পারে।


এই সবকিছু মিলিয়ে তাদের সামনে একটা বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগের সিংহভাগ তারা ব্যবহার করেছে একটি কালচারাল ওয়ার চালাতে, আর এখানেই মূল ভুলটা শুরু হয়েছে।



৫ আগস্টের পর জামায়াত-সমর্থক কিছু বুদ্ধিজীবী, বক্তা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের বক্তব্যে একটা স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়: বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে নতুন করে ফ্রেম করা। 


কেউ বলছেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু ১৯৪৭ থেকে; প্রথম স্বাধীনতা তখন, দ্বিতীয় স্বাধীনতা ২০২৪। একাত্তরকে প্রায় স্যান্ডউইচের মতো মাঝখানে রেখে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। 


কেউ সরাসরি বলছেন, ১৯৭১ নিয়ে এত কথা না, এগুলো ভুলে যেতে হবে, কেউ জাতীয় সংগীত পাল্টানোর দাবি তুলছেন মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। 


সব মিলিয়ে একটা বার্তা গিয়েছে এরা শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন চাইছে না বরং রাষ্ট্রের গল্প বদলে ফেলতে চাইছেএই ধরনের কালচারাল ওয়ার স্বাভাবিকভাবেই এক বড় অংশের ভোটারের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


লিবারেল, সেক্যুলার, মধ্যপন্থী—যাঁরা একে অন্যের সঙ্গে একমত নন, তাঁরাও এই ইস্যুতে অনেক ক্ষেত্রে একজোট হয়েছেন। 


ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা অনেক ভোটারের কাছে হয়ে গেছে বিএনপি বনাম জামায়াত না, বরং ‘কালচারাল ওয়ার বনাম তুলনামূলক নরম বিকল্প।


জামায়াত বুঝতে পারেনি, রাষ্ট্রের ন্যারেটিভ নিয়ে খেলতে গেলে শুধু সংগঠন শক্তি যথেষ্ট না সেখানে আবেগ, ভয়, স্মৃতি, সব একসঙ্গে কাজ করে।


দ্বিতীয় বড় কারণটা হলো সোশ্যাল মিডিয়া–নির্ভর রাজনীতি। স্বীকার করতে হবে, মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য দলগুলোর তুলনায় ফেসবুক-ইউটিউব-টেলিগ্রাম-টিকটকের জগতে জামায়াতের উপস্থিতি অনেক বেশি সংগঠিত। গ্রাফিকস, ভিডিও, লাইভ, ডেটাভিত্তিক পোস্ট এগুলো পরিকল্পনা করে করা হয়েছে।


কিন্তু এই শক্তির পাশে আরেকটা বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গেছে। অনেক অজ্ঞাতনামা আইডি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক মতের মানুষের বিরুদ্ধে গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, ধর্মীয় অপমান—এগুলো রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। 


এদের সবাই যে সরাসরি দলীয় লাইন মেনে চলছে, তা বলা যাবে না, কিন্তু সাধারণ ভোটার এত সূক্ষ্মভাবে আলাদা করে দেখে না। তার চোখে এগুলো জামায়াতপন্থী স্পেস।


ফলে দুটো ফল দেখা গেছে। একদিকে জামায়াতের সমর্থকেরা সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব ভোকাল হয়েছে; অন্যদিকে একটা অর্গানিক প্রতিরোধও দাঁড়িয়ে গেছে, যারা আগে খুব বেশি রাজনীতি করত না, তারাও প্রতিক্রিয়ায় পোস্ট, ভিডিও বানাতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া যুদ্ধ অনেক ক্ষেত্রে শূন্য-যোগের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে গালাগাল বেশি, রাজনীতি কম।


আরেকটি জিনিস মনে রাখা দরকার: বাংলাদেশের ভোটারের বড় একটা অংশ এখনো সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে। বয়স্ক ভোটার, গ্রামীণ সমাজ, কম সংযুক্ত মানুষ, এদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো মুখের কথা, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, পাড়াপড়শির আড্ডা, মসজিদের ইমাম, স্থানীয় শিক্ষক, এ সবকিছুর ওপর নির্ভর করে। 


সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় সেখানে পৌঁছায় খণ্ড খণ্ডভাবে, অনেক সময় বিকৃত হয়ে। ফলে ফেসবুকে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ দেখে যে উচ্ছ্বাস, ভোটবাক্সে গিয়ে তার মাত্রা অনেক কম দেখা গেছে।


তৃতীয়ত, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার এবং ছায়ানট ও উদীচীর ওপর আক্রমণ নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বড় ভূমিকা রেখেছে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্র সংসদে জামায়াত–শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত কিছু নেতার বক্তব্যে এই হামলার পক্ষে উসকানিমূলক ভাষা দেখা গেছে, অন্তত ভিডিও দেখে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। 


একই সময়ে অনেক টক শো বক্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ তুলেছেন, ‘মিডিয়া আমাদের বিরুদ্ধে।’


সমালোচনা করা আর ‘আক্রমণকে বৈধতা দেওয়া’ দুটো আলাদা জিনিস। জামায়াতের অনলাইন কর্মীরা এই পার্থক্যটা রাজনৈতিকভাবে ধরতে পারেনি। 


ফলে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটো মিডিয়া প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হওয়ায় মিডিয়ার সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। সাংবাদিক সমাজে একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে,আর সেই ক্ষত নির্বাচনের আগে পর্যন্ত শুকায়নি


সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় আবেগভিত্তিক ন্যারেটিভ আমাদের ভোট দিলে জান্নাত’ অনেক ট্রাফিক পেয়েছে। কিন্তু ভোটারদের একটি বড় অংশ খুব সাধারণ প্রশ্ন করেছে: আপনারা যদি সরকারে যান, তখন অর্থনীতি কীভাবে সামলাবেন? 


ব্যাংক-দুর্নীতি, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো এগুলোতে আপনারা কী করবেন? এ প্রশ্নের খুব স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষ পায়নি।


রাজনৈতিক কমিউনিকেশন নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা জানেন, মূলধারার মিডিয়া মানে শুধু খবর ছাপা না তারা এজেন্ডা সেট করে, কোন বিষয়টি কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে ওঠতে পারে, অনেক সময় সেটা তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।


জামায়াত যখন তাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে গেল, তখন নিজেদের এজেন্ডা সেটিংয়ের বড় একটা প্ল্যাটফর্ম হারিয়ে ফেলল।


যদি তখনই তারা স্পষ্ট করে বলত, যে-ই সহিংসতা করেছে, সে আমাদের হোক বা না হোক, বিচার চাই, যারা হামলার পক্ষে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করেছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিত এবং মিডিয়ার সঙ্গে খোলামেলা সংলাপে যেত, বিষয়টা হয়তো অন্য রকম হতে পারত। 


তার বদলে ‘মিডিয়া আমাদের শত্রু’ এই লাইন যত জোরালো হয়েছে, ততই মিডিয়া তাদের এড়িয়ে অন্য রাজনৈতিক শক্তির দিকে মনোযোগ দিয়েছে।


আরেকটি বড় সমস্যা ছিল প্রচারণার কনটেন্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় আবেগভিত্তিক ন্যারেটিভ আমাদের ভোট দিলে জান্নাত’ অনেক ট্রাফিক পেয়েছে। কিন্তু ভোটারদের একটি বড় অংশ খুব সাধারণ প্রশ্ন করেছে: ‘আপনারা যদি সরকারে যান, তখন অর্থনীতি কীভাবে সামলাবেন? 


ব্যাংক-দুর্নীতি, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো এগুলোতে আপনারা কী করবেন? এ প্রশ্নের খুব স্পষ্ট উত্তর সাধারণ মানুষ পায়নি। ইশতেহারে কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু এগুলোর প্রচার-প্রসার ততটা হয়নি, যতটা হয়েছে ধর্মীয় ন্যারেটিভের। 


ফলে সাংগঠনিক দল হিসেবে তারা খুব শক্তিশালী, কিন্তু নীতি-প্রস্তাবে কতটা প্রস্তুত? এই প্রশ্ন ভোটারের মাথায় থেকেই গেছে।


ভারতবিষয়ক অবস্থানও একই ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। মাঠের ভাষায় তারা বহুদিন ধরে ভারতবিরোধিতাকেই রাজনীতির কেন্দ্রে রেখেছে। কিন্তু ইশতেহারে এসে প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে, সুসম্পর্কের কথা লিখতে হয়েছে।


আন্তর্জাতিক বাস্তবতা মেনে নিতে হলে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কথায় আর লিখিত নীতিতে যখন এত ফাঁক থাকে, মাঝামাঝি অবস্থানের ভোটারদের মনে সন্দেহ জাগে: যদি ক্ষমতায় যায়, কোন ভাষাটা আসল?


নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াতের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা নারীদের পোশাক, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক ভূমিকা নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য করেছেন, যা শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা শিক্ষিত গ্রামীণ নারী ভোটারের এক অংশের কাছে অস্বস্তিকর লেগেছে বলেই মনে হয়।


বাংলাদেশের ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বেশি নারী। তাঁরা এখন কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায়, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উপস্থিত। তাঁদের চোখে ‘নারী’ আর কেবল পরিবারের ভেতরের পরিচয় নয়, নিজস্ব সামাজিক পরিচয়ও। এই জায়গায় বারবার সংকীর্ণ বার্তা গেলে তাঁরা অন্তত ভোটের ক্ষেত্রে দূরে সরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।


আসনের হিসাবে জামায়াত তার ইতিহাসের সেরা ফল করেছে, কিন্তু ন্যারেটিভের হিসাব-নিকাশে হেরেছে। মানুষের এক অংশ তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও ত্যাগকে স্বীকার করেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মগাথা, নারী অধিকার, প্রতিবেশী সম্পর্ক, মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এসব বিষয়ে তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা দেয়নি। 


এখন প্রশ্নটা জামায়াতের সামনে: তারা কি এই রেজাল্টকে ‘ট্রায়াম্ফ’ হিসেবে পড়বে, নাকি ‘সতর্কবার্তাসহ সুযোগ’ হিসেবে দেখবে?


যদি তারা ধরে নেয়, ‘আমরা জিতে গেছি, পথ ঠিকই ছিল,’ তাহলে হয়তো এই সমর্থন খুব স্থায়ী হবে না। আর যদি তারা বুঝতে চায়, কোথায় ভোটারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে—ইতিহাসের ন্যারেটিভ, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা, মিডিয়ার সঙ্গে সংঘাত, নারীর অবস্থান, নীতি-প্রস্তাবের দুর্বলতা—এবং সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আত্মসমালোচনায় যেতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তারা ভিন্ন ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে।


এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য যেমন ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন, তেমনি রাষ্ট্রের আত্মা ধরে রাখার রেফারেন্ডামও বটে। 


মানুষ আপাতত জানিয়ে দিয়েছে, সংগঠন, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় এবং কালচারাল ওয়ার—এগুলোতে তারা বিরক্ত। শেষ কথা বলে ভোটবাক্স, আর সেখানে মধ্যপন্থী ভোটারের ভয়, আশা ও সন্দেহ, সব একসঙ্গে কাজ করে।



আরো পড়ুন,

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url