অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ‘ভূমিকম্প’ জিম্বাবুয়ের

টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভূমিকম্প ঘটে গেল কলম্বোয়। ক্রিকেটের রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে! তবে কম্পনের নাম হতে পারে ‘অঘটন’—আর সেটা ঘটাল জিম্বাবুয়ে। অস্ট্রেলিয়াকে ২৩ রানে হারিয়ে জিম্বাবুয়ে যেন বুঝিয়ে দিল টেস্ট খেলুড়ে দলগুলোর মধ্যে শক্তিতে ছোট হলেও তাঁরা এখনো ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।


অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ‘ভূমিকম্প’ জিম্বাবুয়ের
ছবি: MBF News
ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে জিম্বাবুয়ের জয়ে দারুণ ভূমিকা রাখেন মুজারাবানি।


জিম্বাবুয়ে: ২০ ওভারে ১৬৯/২। অস্ট্রেলিয়া: ১৯.৩ ওভারে ১৪৬। ফল: জিম্বাবুয়ে ২৩ রানে জয়ী।

বরং প্রেমাদাসার গ্যালারিতে জিম্বাবুয়ের সমর্থকদের জন্য আজীবন মনে রাখার মতো এক স্মৃতি উপহার দিল সিকান্দার রাজার দল। 


একটু বয়স্ক সমর্থকদের জন্য অবশ্য এমন স্মৃতি নতুন নাও মনে হতে পারে। ২০০৭ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপেও কেপটাউনে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে হারিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। 


সেই জয়ের পর আজ এই সংস্করণের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় মুখোমুখিতেও ফল পাল্টাল না। ব্রেন্ডন টেলর নিশ্চয়ই এই জয় উপভোগ করেছেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে।



হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় বেচারা টেলরের বিশ্বকাপ শেষ। ১৯ বছর আগের সেই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোয় ৬০ রানের দারুণ ইনিংস খেলেছিলেন টেলর। 



আজ মাঠের বাইরে থেকে টেলর হয়তো দেখেছেন, তাঁর ভূমিকায় একসঙ্গে কয়েকজন অবতীর্ণ হয়ে কী কাঁপুনিটাই না দিলেন ক্রিকেট–বিশ্বকে। অথচ এই জিম্বাবুয়েই গত টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি!


আগে ব্যাট করে ২ উইকেটে ১৬৯ তোলা জিম্বাবুয়ের হয়ে ৫৬ বলে ৬৪ রানে অপরাজিত ছিলেন ওপেনার ব্রায়ান বেনেট। 


তাদিওয়ানাশে মারুমানির ২১ বলে ৩৫, রায়ান বার্লের ৩০ বলে ৩৫ এবং রাজার অপরাজিত ১৩ বলে ২৫ রানের ইনিংসে লড়াকু স্কোর পেয়ে যায় তাঁরা। 


বোলিংয়ে জিম্বাবুয়ে যতটা ভালো করেছে, তার চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাই চোখে বিঁধেছে বেশি। 


শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারও খেলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ১৯.৩ ওভারে ১৪৬ রানে অলআউট হয় ২০২১ সালের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নরা।



দলে চোটের হানা থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই রান মোটেও বড় হয়ে ওঠার কথা নয়। কিন্তু ৪.৩ ওভারের মধ্যে ২৯ রানে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেট হারানোর পর অনেকের মনেই হয়তো উঁকি দিতে শুরু করেছিল, সেদিন নেপাল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে জিততে না পারলেও আজ কিছু একটা হয়ে যেতে পারে! 



অষ্টম ওভার শেষে পায়ের চোটে (ক্র্যাম্প সম্ভবত) জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক সিকান্দার রাজা মাঠের বাইরে চলে যাওয়ার পর অবশ্য দুশ্চিন্তায়ও পড়েছেন জিম্বাবুয়ের সমর্থকরা। বোলার নিয়ে সংকট দেখা দেওয়ার ভয় ছিল তাদের।


তবে ম্যাক্সওয়েল দাঁড়াতে পারলে অস্ট্রেলিয়াকে কোনো চিন্তাই করতে হতো না। পঞ্চম উইকেটে ম্যাট রেনশর সঙ্গে ৫৯ বলে ৭৭ রানের জুটি গড়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। 


১৪.২ ওভারে বার্লের লেগ স্পিনে ম্যাক্সওয়েল (৩২ বলে ৩১) দূর্ভাগ্যজনকভাবে যখন বোল্ড হলেন তখন জয়ের জন্য ৩৪ বলে অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল ৬৪। 


মার্কাস স্টয়নিস ক্রিজে আসায় জিম্বাবুয়ের সমর্থকরা তখনও হয়তো জয়ের স্বপ্ন দেখতে ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু বোলিংয়ের সময় হাতে আঘাত পাওয়া স্টয়নিস (৪ বলে ৬) পরের ওভারেই হ্যামিল্টন মাসাকাদজার বলে আউট হওয়ার পর ম্যাচের পাল্লা কিছুটা হেলে পরে জিম্বাবুয়ের দিকে। 


ফিফটি তুলে নেওয়া রেনশ ক্রিজে থাকায় অস্ট্রেলিয়া এরপরও চেষ্টা করেছে। ১৯তম ওভারে তিন বলের মধ্যে ব্লেসিং মুজারাবানি রেনশ (৪৪ বলে ৬৫) ও অ্যাডাম জাম্পাকে তুলে নেওয়ার পর আর কিছুই করার ছিল না অস্ট্রেলিয়ার।



এই মুজারাবানিই অস্ট্রেলিয়ার শুরুর বিপর্যয়ের হোতা। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে দ্বিতীয় ওভার এবং নিজের প্রথম বলেই তুলে নেন ওপেনার জস ইংলিশকে। আরেক পেসার ব্রাড ইভানসের কৃতিত্বও কম নয়।


 ইনিংসের পঞ্চম ওভারের মধ্যে ইভানস তুলে নেন ট্রাভিস হেড এবং ক্যামেরন গ্রিনকে। এর মধ্যে টিম ডেভিডকেও ফেরান মুজারাবানি। 


৪ ওভারে ১৭ রানে ৪টি উইকেট নেওয়া মুজারাবানির টি–টুয়েন্টি ক্যারিয়ারে এটাই সেরা বোলিং। দেশের হয়ে টি–টুয়েন্টিতে শততম উইকেটের দেখাও পেলেন। ৩.৩ ওভারে ২৩ রানে ৩ উইকেট ইভানসের।


ব্যাটিংয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংস টেনেছেন মূলত বেনেট। ৭.৩ ওভারে ওপেনিং জুটিতে মারুমানির সঙ্গে গড়েন ৬১ রানের জুটি। এরপর বার্লের সঙ্গে ৫১ বলে ৭০ এবং রাজার সঙ্গে ২৪ বলে ৩৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন।


ফিল্ডিংয়েও খুব ভালো করেছে জিম্বাবুয়ে। বিশেষ করে ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিংয়ের সময় দুটি নিশ্চিত বাউন্ডারি বাঁচিয়েছে জিম্বাবুয়ে। পাশাপাশি ১৮তম ওভারে বেন ডারউইশের দুর্দান্ত ক্যাচ নেন বেনেট।



টানা দুই জয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘বি’ গ্রুপে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে উঠে এল জিম্বাবুয়ে। সুপার এইটে ওঠার পথটা তাদের জন্য আরেকটু মসৃণ হলো। 


শ্রীলঙ্কার (৩.১২৫) সংগ্রহও ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট, তবে জিম্বাবুয়ের (১.৯৮৪) সঙ্গে রান রেটে এগিয়ে শীর্ষে তারা। ২ ম্যাচে ১ জয় ও ১ হারে ২ পয়েন্ট নিয়ে তিনে অস্ট্রেলিয়া (১.১০০)। গ্রুপ পর্বে আর দুটি ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। 


প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা ও ওমান। আগামী সোমবার শ্রীলঙ্কার কাছে হারলে অস্ট্রেলিয়ার সুপার এইটে ওঠার পথ দৃশ্যত রুদ্ধ হয়ে যাবে।



সংক্ষিপ্ত স্কোর:

জিম্বাবুয়ে: ২০ ওভারে ১৬৯/২ (বেনেট ৬৪, মারুমানি ৩৫, বার্ল ৩৫, রাজা ২৫, জাম্পা ০/৩১, এলিস ০/৩৪, স্টয়নিস ১/১৭)


অস্ট্রেলিয়া: ১৯.৩ ওভারে ১৪৬ (রেনশ ৬৫, ম্যাক্সওয়েল ৩১, হেড ১৭, মুজারাবানি ৪/১৭, ইভানস ৩/২৩, বার্ল ১/৯, মাসাকাদজা ১/৩৬)


ফল: জিম্বাবুয়ে ২৩ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা: ব্লেসিং মুজারাবানি (জিম্বাবুয়ে)।




ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন,

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url