নতুন ভোটারদের ভাবনা জীবনের প্রথম ভোট তাঁরা নির্ভয়ে দিতে চান

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা ও বিজয় ২৪ হলের পাশে সেলিম মামার চায়ের দোকান। দোকানের সামনে বটতলায় আড্ডা দেন শিক্ষার্থীরা। আজ রোববার মিষ্টি শীতের সকালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাঁদের আলোচনার বিষয় নির্বাচন। তাঁরা বলেন, আগে তাঁরা ভোটার হলেও কখনো ভোট দিতে পারেননি। তাই এবারই জীবনের প্রথম ভোট দিতে চান। এ জন্য নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ চান।


নতুন ভোটারদের ভাবনা জীবনের প্রথম ভোট তাঁরা নির্ভয়ে দিতে চান
ছবি: MBF News
শিক্ষার্থীদের আড্ডায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আজ রোববার দুপুরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা ও বিজয় ২৪ হলের পাশে চায়ের দোকানের সামনে।


এখানে আড্ডায় অংশ নিয়েছেন রশিদ সরদার। তিনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তিনি ভোটের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, ‘ভোটার হলেও এর আগে কখনো ভোট দিতে পারেননি।


এবারই প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই আনন্দ-উচ্ছ্বাস তো আছেই। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে এখনো শঙ্কাও আছে।’ তাঁর আশঙ্কা, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ছড়াতে পারে। বিজয়ী দল অন্যদের ওপর আক্রমণ করতে পারে।


রশিদ সরদার প্রশ্ন তোলেন, সরকার গঠনের পর মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা থাকবে তো? নাকি আবার ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসবে? দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না বলেও মনে করেন তিনি। 


তাঁর মতে, মানুষের আস্থার জায়গা সেনাবাহিনী। তবে সেনাবাহিনী যেন নির্বাচনকে প্রভাবিত না করে, বরং নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থানে থাকে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।


আড্ডায় থাকা সবাই তরুণ ভোটার। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ হয়নি। 


এবারই প্রথম ভোট দেবেন তাঁরা। তবে হতাশাও প্রকাশ করেন তরুণ এই ভোটাররা। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তাঁদের শঙ্কার প্রধান কারণ।


ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী জাফর আহমেদের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়। তিনি বলেন, ‘পছন্দের ব্যক্তিকেই ভোট দিতে চাই। কিন্তু যে দল ক্ষমতায় যাবে, তারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারবে কি না,


সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। খরচের কথা বিবেচনা করে অনেক শিক্ষার্থী ভোট দিতে যেতে চাচ্ছেন না। দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ভোট দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।


তাঁর কথা শেষ না হতেই কথা কেড়ে নিলেন একই বিভাগের আসিফ। পটুয়াখালীর বাউফলের আসিফ কথা বলেন গণভোট নিয়ে।


তিনি বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী দল গণভোটের ফলাফল মেনে নিয়ে গণভোটের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবে কি না, সেটা নিয়েই তিনি শঙ্কিত। 


তাঁর মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে অন্তর্বর্তী সরকারকেই এসব বাস্তবায়ন করে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। 


কারণ, দলীয় সরকারের স্বাভাবিকভাবেই এটা না মানার সম্ভাবনা বেশি। তাই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই সময়টুকু দেওয়া উচিত।


এর মাঝে আলোচনা থেকে বিদায় নেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রাজীব চৌধুরী ও হৃদয় হোসেন। আলোচনায় আরও যুক্ত হন বাগেরহাটের সাকিব। 


বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবের কাছে কয়েকজন একসঙ্গে জানতে চান, নির্বাচন নিয়ে তাঁর ভাবনা কী? তবে সাকিব কথা বলতে নারাজ। 


তাঁর মতে, তাঁর এলাকার মানুষ এখনো প্রায় জিম্মি অবস্থায় আছে। সাধারণ মানুষ এখনো কথা বলতে ভয় পায়।


শিক্ষার্থীরা বলেন, মানুষ যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গণ–অভ্যুত্থান করেছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। দুর্নীতি কিছুটা কমলেও এখন ‘মব’ তৈরি করে যার তার ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে। 


আগে প্রশাসন ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করত, এখন অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। নতুন সরকারকে জনগণের পালস বুঝে কাজ করতে হবে।


সৌরভ হোসেনের (সৈকত) বাড়ি কুমিল্লা। আগের মতো ভোটকেন্দ্র দখল হয় কি না, এটা নিয়েই তাঁর শঙ্কা। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। 


পুলিশ প্রশাসনের প্রতি মানুষের তেমন আস্থা নেই। সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। তাই সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থান দরকার।


তিনি আরও বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এখনো গণভোট বিষয়টি ঠিকমতো বোঝেন না। প্রান্তিক মানুষকে গণভোট কী, ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’র পার্থক্য কী—তা স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে।


দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন আরেক শিক্ষার্থী তৌহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো যুগোপযোগী নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু থিওরি পড়ানো হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যাচ্ছে না। 


এখানে শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া হয়, কিন্তু কোয়ালিটি (মান) নিশ্চিত করা হয় না। শিক্ষকেরাও অনেক ক্ষেত্রে কোয়ালিটিফুল নন। তাই নতুন সরকারকে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে। 


আগামী সরকারের কাছে তাঁর প্রত্যাশা, নতুন সরকারে যে–ই আসুক না কেন, তাঁরা যেন সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করেন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়নে প্রাধান্য দেন।


১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। বরিশালে ছয়টি সংসদীয় আসনে ৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলায় মোট ভোটার ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৮ জন।



নির্বাচন থেকে আরো পড়ুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url